বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে ৩৩% নারীর অন্তর্ভুক্তির দাবী

বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে ৩৩% নারীর অন্তর্ভুক্তির দাবী

ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় “নারীর জয়ে সবার জয়” ক্যাম্পেইনের আওতায় গত ২১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে ঝালকাঠি জেলার প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে রাজনৈতিক দলের মূল কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। বৈঠকে মূলত নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের আইনী কাঠামোসমূহের  আলোকে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অবস্থান ও ক্ষমতায়ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয় এবং দলের মূল কমিটিতে নারী অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জাতীয়তাবাদী দলের বরিশাল অঞ্চলের ঝালকাঠি জেলার নেতৃবৃন্দরা গুরুত্বারোপ করেন।

এই অনুষ্ঠানে প্যানেল হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসরাত জাহান সোনালী, সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঝালকাঠি জেলা; এডভোকেট সাকিনা আলম লিজা, সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, ঝালকাঠি জেলা; ডালিয়া নাসরিন, সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঝালকাঠি জেলা; মমতাজ বেগম, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, ঝালকাঠি জেলা; হোসনেয়ারা মান্নান, আহŸায়ক, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ, ঝালকাঠি জেলা; নাজমুন্নাহার পুতুল, সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, রাজাপুর উপজেলা।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের চালকের আসনে নারী। দুটি প্রধান দলের শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্ব থাকা সত্তে¡ও আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো নারীর ক্ষমতায়নের সহায়ক নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এমন উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চা বাড়াতে পারলে তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা সম্ভব। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২০০৯ (সংশোধিত) অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যেই মূল দলের সকল পর্যায়ের কমিটিগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ৩৩% নারী অন্তর্ভুক্ত  করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, জাতীয় পর্যায়ের কমিটিতে নারী অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত দলের নের্তৃত্বস্থানীয় পদগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য। এসকল বাধা দূরীকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্যে নারী নেতৃবৃন্দ সকল রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরেন:

  • গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২০০৯ (সংশোধিত) ধারা ৯০বি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এই সেল রাজনৈতিক দলের মূলধারার কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে কি না তা নিয়মিতভাবে মনিটর করবে;
  • খুব শীঘ্রই দলগুলো তাদের কাউন্সিল করবে। সুতরাং নির্বাচন কমিশন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী অন্তর্ভুক্তির সময় সীমা স্মরণ করিয়ে চিঠি প্রদান করতে হবে;
  • গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতির উপর রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নির্বাচন কমিশনে বাৎসরিক প্রতিবেদন পেশ করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। সেখানে কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতি বিষয়ে উল্লেখ থাকতে হবে;
  • কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূলে ৩৩ শতাংশ নারীর অন্তর্ভুক্তি বাস্তবায়নের জন্যে একটা নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। একইভাবে জেলা বা মহানগর থেকে উপজেলা এবং থানা পর্যায়ে এই আইন বাস্তবায়নের জন্যে নির্দেশনা প্রদান করতে হবে;
  • কেন্দ্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলে একটা মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। মহিলা বিষয়ক সম্পাদককে প্রধান করে একটি সাব কমিটি তৈরি হতে পারে দলে যারা তৃণমূলের কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি অগ্রগতি মনিটরিং করবে;
  • সকল পর্যায়ে কমিটিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী অন্তর্ভুক্ত না থাকলে কমিটি অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে;
  • দলের মধ্যে সকল কার্যক্রমে নারীদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিভিন্ন মিটিং এর সময় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে নারীরা অংশগ্রহণ করতে পারে। সর্বোপরি নারী-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে;
  • সম্পাদকীয় পদসহ সকল নেতৃত্বস্থানীয় পদের বিস্তারিত দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে এবং তা দলের গঠনতন্ত্রে উলে­খ থাকতে হবে। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সকল কমিটিতে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে;
  • আগ্রহী নারীদেরকে উৎসাহী করতে উঠান বৈঠক করতে হবে। তাদেরকে দলের বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে;
  • রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে আচরণবিধি থাকতে হবে। পাশাপাশি নারী-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণের বিধির বিষয়টি বিধিমালাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। দলের মধ্যে আভ্যন্তরীন দ্ব›দ্ব মীমাংসার জন্যে একটি পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ফলে নারীর প্রতি যে কোন অসৌজন্যমুলক আচরণ রোধ করা সম্ভব হবে এবং নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়বে;
  • কাউন্সিল প্রস্তুত কমিটিতেও নারীর অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে;
  • নারীদের রাজনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে
  • রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারকে বিভিন্ন প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন অর্থ অথবা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। আবার আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলসমূহকে উদ্বুদ্ধ করতে যে দল নির্বাচনে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিবে তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ প্রণোদনা হিসেবে প্রদান করা হবে।

নারী নেতৃবৃন্দদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল প্রস্তুতকারী কমিটির ৪ টি উপজেলার ৩ টির ৩ নারী নেতৃ, তারা মূলদলে নারী অন্তর্ভুক্তিতে তাদের প্রচেষ্টা ও অগ্রগতির গল্প তুলে ধরেন। কাঠালিয়া উপজেলার আফরোজা আক্তার লাইজু বলেন, তার উপজেলার এক ওয়ার্ড কমিটি গঠনকালে এক যোগ্য নারী নেতাকে সভাপতি করার প্রস্তাবনা দেন। এতে শুরুতে অন্যরা রাজী না থাকলেও, তিনি তাদের ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তির কথা ও দেশপ্রধান যে একজন নারীনেতৃ আর সেই সাথে যেহেতু প্রস্তাবিত নারী যোগ্যতাসম্পন্ন, সেগুলো বলে বোঝাতে সক্ষম হন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের কার্যক্রমের মাধ্যমেই তিনি মূলদলে নারী অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে অনুপ্রাণিত ও সচেতন হয়েছেন।

সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের উত্তরে নারী নেতৃবৃন্দরা বলেন, আগের থেকে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে। এইযে তারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নারীনেতৃরা তাদের রাজনৈতিক অধিকারের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করছেন, এটাও এক অগ্রযাত্রা।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নারী নেতৃবৃন্দ, ডিআই এর রাজনৈতিক ফেলো ও সাংবাদিকবৃন্দ।

“নারীর জয়ে সবার জয়” ক্যাম্পেইন এডভোকেসি, প্রশিক্ষণ এবং নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা করছে। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় প্রায় ২০,০০০ এর অধিক নারীর একটি ক্রমবর্ধমান বহুদলীয় নেটওয়ার্ক আছে এবং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সারা দেশে ৪৪৩ টি তৃণমূল কমিটিতে ৫৫৭০ জন নারীকে অন্তর্ভূক্ত হতে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

এই অনুষ্ঠানটি ইউএসএআইডি ও ইউকেএইড এর যৌথ অর্থায়নে `Strengthening Political Landscape in Bangladesh’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে আয়োজন করা হয়। উল্লেখ্য, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব অর্জনের লক্ষ্যে সক্রিয় নাগরিকবৃন্দ ও সংবেদনশীল সরকারসমূহকে সহায়তা প্রদান করছে এবং সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলসমূহকে সাথে নিয়ে কাজ করছে।

Digiqole ad Digiqole ad

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *